দেওয়ানগঞ্জবিশেষ সংবাদ

রহস্যময় ‘গায়েবী মসজিদ’

মহসিন রেজা রুমেল, দেওয়ানগঞ্জ: জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানি ইউনিয়নে এক গম্বুজওয়ালা একটি প্রাচীন মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও মসজিদের ভেতরে ভাসে ইতিহাসের মৃদু সুর। মসজিদটি কে নির্মাণ করেছিলেন-তা আজও অজানা সবার। তাই স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত “গায়েবী মসজিদ” নামে।

এক শতাংশের কম জমি নিয়ে মসজিদটির দেয়ালজুড়ে প্রাচীন নকশা ও গম্বুজে রয়েছে সময়ের ছাপ। দুই পাশে দুটি জানালা, সামনে ছোট্ট দরজা-সরল গড়নে গভীর সৌন্দর্য। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়; এটি ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা আর অদেখা কাহিনীর নীরব ঠিকানা। আর এই মসজদি ঘিরে রয়েছে নানা কল্প কাহিনী।

স্থানীয়রা জানান- পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতানি আমলে যমুনার তীরে আসেন কয়েকজন ধর্মপ্রচারক। এখানে গড়ে তোলেন খানকাহ ও মসজিদ। সেখান থেকেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের আলো।

স্থানীয় রাতুল করিম উল্লা বলেন-“আমার দাদা ও তার আগের প্রজন্মের মানুষদের কাছে জানতে চেয়েছি-এই মসজিদ কবে নির্মিত হয়েছে, সে বিষয়ে কেউই সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। তবে ধারণা করা হয়, মসজিদটির বয়স আনুমানিক সাত থেকে আটশ’ বছরের মতো হবে।”

সাজু নামে স্থানীয় একজন বলেন- “মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনেছি, একসময় এই জায়গাটি ওলু মাটি ও ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। পরবর্তীতে জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ করেই একটি মসজিদের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। তখন থেকেই এর নামকরণ হয় গায়েবি মসজিদ।

হেলাল মিয়া নামে একজন বলেন- “ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যেই সাহাবীরা এই স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন এবং এই জায়গা থেকেই দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়। এই মসজিদের আশেপাশে দুইটি দাড়িওয়ালা সাপ ছিলো। আমরাও মাঝে মধ্যে দেখেছি। এই সাপ দুইটি কারো কোনো ক্ষতি করতো না। একটি মেরে ফেলার পরে, অন্যটিকে এখন আর দেখা যায় না।”

শুরুতে ইমামসহ মাত্র ২১ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতেন গায়েবী মসজিদে। সময়ের সাথে বেড়েছে কাতার, বড় হয়েছে মসজিদ। এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ভরে ওঠে প্রাঙ্গণ। শিশুদের কোরআন তেলাওয়াতে মুখর থাকে চারদিক- যেন শত বছর পরও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যায় এখান থেকে। মুসল্লিদের দানেই চলে এখানকার সব কার্যক্রম। ভালোবাসা আর ঈমানেই টিকে আছে এই প্রাচীন প্রার্থনালয়।

আলী হোসেন নামে একজন মুসুল্লি বলেন-“দূর-দূরান্ত থেকে এই মসজিদ দেখতে আসেন অনেকে। মনের আশা পূরণের জন্য করেন মানত ও দোয়া। প্রতি মাসে এই মসজিদের দান বাক্সে এক লাখ-দুই লাখ টাকা পাওয়া যায়। সেই অর্থ দিয়েই মসজিদ পরিচালিত হয়। সব খরচ হয়।”

হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করা একজন ব্যক্তি রয়েছেন মসজিদটির খাদেম হিসেবে। ইসলামের শান্তিতে তৃপ্ত খাদেমের পুরো জীবনটিই এখন এই মসজিদ ঘিরে। আর প্রতিদিনের তুলনায় শুক্রবারের জুম্মার নামাজে দূর দূরান্ত থেকে মুসুল্লিদের আগমন ঘটে বলে জানিয়েছে ইমাম।

খাদেম বলেন- “আমি আগে হিন্দু ছিলাম। পরে আমার পুরো পরিবার ২০১৭ সালে ইসলাম গ্রহণ করেছে। মুসলিম হওয়ার পর থেকে আমি গভীর শান্তি অনুভব করছি। এই মসজিদের খাদেম হিসেবে থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।”

মসজিদের ইমাম মোঃ মূসা বলেন- “প্রতিদিন গড়ে একশ থেকে দুইশ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন। আর শুক্রবার হলে আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এসে জুমার নামাজ আদায় করেন।”

দেওয়াগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন-‘উপজেলা প্রশাসন এই মসজিদের ইতিহাসের বিষয়ে কিচু জানে না। এই মসজিদের সঠিক ইতিহাস যাতে দেওয়ানগঞ্জবাসী জানতে পারে। সেই বিষয়ে আমরা অচিরেই একটি উদ্যোগ গ্রহন করবো। আমরা প্রত্নতত্ব বিভাগের সাথে যোগাযোগ করবো। ’

ইতিহাসের ভার বহন করে, রহস্যের আবরণ গায়ে মেখে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে গায়েবী মসজিদ। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি শুধু জামালপুর নয়, বরং পুরো ময়মনসিংহ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নপর্যটন ও ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এমনটাই মনে করেন স্থানীয়রা।

Related Articles

Back to top button