ঋণের বোঝায় ডুবছে যমুনার জেলেদের জীবন
ফিরোজ শাহ, ইসলামপুর: জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল পাইলিং ঘাটে প্রতিদিন ভোরে যমুনা নদীর তাজা মাছ বেচাকেনার ধুম পড়ে। দেশজুড়ে যমুনার মাছের কদর থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের হাঁকডাকে মুখর থাকে পুরো ঘাট। তবে এই ব্যস্ততার আড়ালে চাপা পড়ে থাকে জেলেদের দীর্ঘশ্বাস। নদীতে দিন দিন মাছ কমে যাওয়া, মহাজনদের ঋণের চড়াসুদ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে যমুনার তীরবর্তী জেলে পরিবারগুলোর জীবনসংগ্রাম।
ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা নিয়ে যমুনার বুকে নেমে পড়েন জেলেরা। রাতভর পরিশ্রম শেষে ঘাটে ভিড়লেও অনেকের ঝুড়িতেই মেলে সামান্য মাছ, যা বিক্রি করে সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। নদীতে পানি বাড়লে মাছ মিললেও শুকনো মৌসুমে নদী শুকিয়ে গেলে জেলেদের অলস সময় পার করতে হয়। এ সময় সংসার চালানো, নৌকা ও ছেঁড়া জাল মেরামতের জন্য তাদের হাত পাততে হয় আড়তদার বা মহাজনদের কাছে।
সাপধরী এলাকার জেলে রবিজল জানান, বর্ষা মৌসুমে কিছু মাছ ধরা গেলেও শুকনো মৌসুমে পুরো বেকার বসে থাকতে হয়। তখন বাধ্য হয়েই মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়। পরে সেই ঋণের টাকা ও সুদ শোধ করতে ধরা মাছের একটি বড় অংশ আড়তদারের হাতে তুলে দিতে হয়।
আরেক জেলে শ্রী নরেশ চন্দ্র জানান, নদীতে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় উপার্জনে টান পড়েছে। ফলে সংসার চালাতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে বংশানুক্রমিক এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
ঘাটের পুরোনো নিয়মানুযায়ী আড়তদারের মাধ্যমে মাছের দাম নির্ধারিত হওয়ায় নিজের ধরা মাছের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতাও জেলেদের হাতে থাকে না।
গুঠাইল ঘাটের আড়তদার রিপন মিয়া জানান, বছরের শুরুতে জাল ও নৌকা মেরামত করার জন্য জেলেরা অগ্রিম টাকা নেয়, যা তারা প্রতিদিনের ধরা মাছ দিয়ে শোধ করে। মাছ বিক্রির পর ঋণের কিস্তি রেখে বাকি টাকা জেলেদের হাতে দেওয়া হয়।
আরেক আড়তদার রবিউল জানান, যমুনা নদীর সুস্বাদু মাছের দেশব্যাপী চাহিদা থাকায় প্রতিদিন জেলার বাইরে থেকেও প্রচুর পাইকার এখানে আসেন।
যমুনার উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে যারা মানুষের পাতে মাছ তুলে দেন, তাদের নিজেদের পাতে প্রতিদিন খাবার জোটে কি না, সেই খবর রাখা হয় না। মাছের সঙ্গে নদী থেকে বেঁচে থাকার যে স্বপ্ন তারা তুলে আনেন, ঋণের বোঝা আর অভাবের কড়াঘাতে তা বারবার ডুবে যায় যমুনার জলরাশিতে।




