ইসলামপুরপ্রধান খবর

যমুনার চরে বেঁচে থাকার লড়াই: স্বাস্থ্য ও শিক্ষাবঞ্চিত ৩০ হাজার মানুষ

ফিরোজ শাহ, ইসলামপুর: নদী ভাঙে, চর জাগে। যমুনার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নাগরিক জীবনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত। স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আধুনিক যোগাযোগের অভাবে এই চরবাসীর প্রতিদিনের জীবন কাটছে বেঁচে থাকার এক কঠিন সংগ্রামে।

সবচেয়ে করুণ চিত্র স্বাস্থ্যসেবায়। সাপধরী ও চিনাডুলী ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলে মাত্র দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেগুলো নিয়মিত খোলা পাওয়া যায় না।

সাপধরী মন্ডলপাড়া গ্রামের আমিনুর ইসলাম জানান, মাসে মাত্র এক বা দুই দিন স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা মেলে। ফলে অসুস্থ হলে চরবাসীর শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের ক্ষেত্রে এই সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রসববেদনা উঠলে রাতের অন্ধকারে উত্তাল যমুনা পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথটি হয়ে ওঠে জীবন ও মৃত্যুর লড়াই। চর শিশুয়া গ্রামের আকলিমা বেগম তার ১০ মাস বয়সী অসুস্থ শিশুকে নিয়ে ক্লিনিকে এসে সেটি বন্ধ পান। দুর্গম চরে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বিনা চিকিৎসায় তাকে ফিরে যেতে হয়।

চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষাতেও চরমভাবে পিছিয়ে আছে চরাঞ্চলের শিশুরা। এলাকাগুলোতে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাত্র একটি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয় ভবন থাকলেও শিক্ষকরা নদী পার হয়ে নিয়মিত আসতে চান না। সাপধরী এলাকার আব্দুল হাকিম প্রামাণিক জানান, শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি ও যোগাযোগ সংকটের কারণে শিশুরা স্কুলমুখী হতে চাইছে না। বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করছেন।

দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনায় চরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় আবেদ আকন্দ আক্ষেপ করে বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ যেন অবহেলিত। মনে হয় তারা এ দেশের নাগরিকই নন। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবাগুলোর এমন বেহাল দশা তাদের চরমভাবে হতাশ করেছে। চরবাসীর একটাই দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, দুর্গম চরাঞ্চলে স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান এবং উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সাপধরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম মন্ডল জানান- উপজেলা সদর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন এই এলাকার মানুষের অধিকার নিশ্চিতে প্রশাসনের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. জুবায়ের জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন এবং সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই মানুষগুলো নদীভাঙন ও বন্যার সঙ্গে অভ্যস্ত। কিন্তু মৌলিক অধিকারের জন্য তাদের এই প্রতিদিনের যুদ্ধ প্রমাণ করে উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে তারা এখনো অনেক দূরে। যমুনার বুকের এই মানুষগুলো দয়া নয়, চান তাদের ন্যায্য নাগরিক অধিকার। অন্তত রাষ্ট্র যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়, এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।

Related Articles

Back to top button