মাদারগঞ্জপ্রধান খবর
মা নেই, বাবা অসুস্থ-প্রতিবন্ধী দুই সন্তানের জীবন এখন যুদ্ধের ময়দান
শাওন মোল্লা,জামালপুর: জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার মোমেনাবাদ গ্রামের একটি ছোট্ট টিনের ঘর। চারপাশে সবুজ আর শান্ত পরিবেশ থাকলেও সেই ঘরের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক পরিবারের অসহনীয় কষ্টের গল্প। প্রতিটি দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তায়, আর শেষ হয় বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামে।পরিবারটির দুই সন্তানই জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। তাদের একমাত্র ভরসা ৬৫ বছর বয়সী অসুস্থ বাবা জিয়ার উদ্দিন। নেই স্থায়ী উপার্জন,নেই কোন স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ। তবুও থেমে নেই তাদের বেঁচে থাকার লড়াই।
৩০ বছর বয়সী মো. উজ্জ্বল জন্মগতভাবে দুই পা বিকলাঙ্গ, স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানো বা হাঁটা তার পক্ষে সম্ভব নয়। হামা গুড়ি দিয়েই তাকে চলতে হয় ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কিন্তু নিজের অসহায়ত্বের কাছে হার মানেননি তিনি। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়েই পৌঁছে যান রান্নাঘরে। কোনোভাবে চুলা জ্বালিয়ে রান্না করেন পরিবারের জন্য একমুঠো ভাত।
উজ্জ্বলের বড় বোন ৩৫ বছর বয়সী জুলেখাও জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগছেন। তার শরীর সবসময় কাঁপে, হাত-পায়ে নেই প্রয়োজনীয় শক্তি। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসা ও সেবা, কিন্তু অর্থের অভাবে তা অধরাই থেকে গেছে।
এই দুই সন্তানের একমাত্র অভিভাবক জিয়ার উদ্দিন উচ্চ রক্তচাপসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। প্রায় এক দশক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনিই সামলে আসছেন পুরো সংসার। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা ও অভাবের চাপে তিনিও আজ অসহায়।
জিয়ার উদ্দিন বলেন-‘আমার দুইটা সন্তানই জন্ম থেকেই অসুস্থ। তাদের জন্য কিছু করতে পারি না, এই কষ্টটা বুকের ভেতর নিয়ে বাঁচি। নিজের শরীরও ভালো না। কাজ করতে পারি না। অনেক সময় না খেয়েই দিন কাটাতে হয়। অনেক কষ্টে দিন কাটে আমাদের।’
এই পরিবারটির ঘরে অভাব যেন স্থায়ী অতিথি। ঠিক মতো চুলায় জ্বলে না আগুন। ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। কখনও কখনও না খেয়েই কাটাতে হয় পুরো দিন। সরকারি সামান্য ভাতা এবং প্রতিবেশীদের সহানুভূতিই তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
স্থানীয় এলাকার এক বাসিন্দা নাহিদ ইসলাম বলেন-‘আমরা নিজেরা যা পারি সাহায্য করি। কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না। সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা হলে পরিবারটি বাঁচার সুযোগ পাবে।

সম্প্রতি পরিবারের এই করুণ চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন স্বেচ্ছাসেবক মামুন বিশ্বাস। তার মানবিক আহ্বানে সাড়া দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরে তিনি নিজেই উপস্থিত হয়ে পরিবারটির হাতে তুলে দেন নগদ ১ লাখ ৩ হাজার টাকা এবং প্রায় ২৮ হাজার টাকার খাদ্যসামগ্রী। চাল, ডাল, মাছ, মুরগি, তেল ও কাপড় পেয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে পরিবারটির মুখে। পাশাপাশি প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবকরা।
স্থানীয়দের মতে, এই পরিবারের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও স্থায়ী পুনর্বাসন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারি সহায়তা পেলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারে তারা।




