খাল খনন প্রকল্পের ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ফেরত
স্টাফ রিপোর্টার: জামালপুরে খাল খনন শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। জেলায় শ্রমিক সংকট থাকায় যান্ত্রিক উপায়ে খনন করা হয় চারটি খাল। তাই ফেরত দেওয়া হয় মোট বরাদ্দের অর্ধেক টাকা। এতে করে হাসিল হয়নি এই প্রকল্পের সকল উদ্দেশ্য। তবে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা বলছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা।
দেশব্যাপী সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং জলাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্যে ৫৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচী হাতে নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে জামালপুর জেলা সদর, ইসলামপুর ও মাদারগঞ্জ উপজেলায় চারটি খাল খনন করা হয়। মজুরী এবং উপকরণ ও আনুষাঙ্গিক খাতসহ সব মিলিয়ে ২২ কিলোমিটার খাল খননে ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা। তবে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকার মধ্যে এসব খাল খনন সম্পন্ন করে কর্তৃপক্ষ।
মাদারগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা যায়- পলিশাতে খাল খনন করার জন্য বরাদ্দ ছিলো ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা। এর মধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে- ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৫ টাকা। তেঘরিয়াতে খাল খনন করার জন্য বরাদ্দ ছিলো ১ কোটি ১৫ লাখ ৯১ হাজার ১১৪ টাকা। এর মধ্যে ফেরত দেয়া হয়েছে ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার ৯১৫ টাকা। এই উপজেলায় মোট সাড়ে ৯ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়।
ইসলামপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা যায়- জিয়া খালের ৮ কিলোমিটার খনন করতে বরাদ্দ ছিলো ২ কোটি ৬ লাখ ৩ হাজার ৮০ টাকা। কাজ শেষে ফেরত দেয়া হয়েছে ৯৮ লাখ ৮১ হাজার ৯১৬ টাকা।
জামালপুর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা যায়- সাড়ে ৪ কিলোমিটার গবাখালী খনন করতে বরাদ্দ ছিলো ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা । কাজ শেষে ফেরত দেয়া হয়েছে ৬৩ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৯ টাকা।
সব মিলিয়ে খাল খনন শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৮৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। শ্রমিক সংকট থাকায় এসব খাল খনন সম্পন্ন করা হয়েছে যান্ত্রিক উপায়ে। শ্রমিকের মজুরী কম থাকায় এমনটা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

মাদারগঞ্জের কাটাখালী খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি মোঃ আজাদ- “আমাদের যে সময় খাল খনন শুরু হয়েছে, ওই সময়কালে ধান কাটা ছিল। ৫০০ টাকা মজুরির কারণে আমাদের লেবার কোনো কাজ করে নাই। ওই সময়কালে ১০০০ টাকা মজুরি ধান কাটার। ১১০০, ১২০০ পর্যন্ত হয়ে গেছিলগা। এখনও যে মজুরি, যদি একটা লেবার নিতে চাই, এখন ৭০০ টাকা নিচ্ছে। তাই আগামীতেও শ্রমিক পাওয়া যাবে না কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।”
ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোঃ হাবীবুর রহমান সুমন বলেন- “ খাল খননের সময় বোরো সিজনের ধান কাটা চলমান ছিল। সেজন্য আসলে শ্রমিক সংকট দেখা দেয় এবং ওই সময় আসলে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণেও শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এজন্য শ্রমিক মজুরির অংশটুকু আমাদের কিছুটা কাজ ব্যাহত হলেও আমরা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সেই কাজগুলা ওভারকাম করে, আমরা সুন্দরভাবে কাজ করাতে সম্পূর্ণ হয়েছি।”
মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ তাজ উদ্দিন বলেন- “৫০০ টাকা মজুরিতে লেবার না পাওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তালিকা দিতে সক্ষম হয় নাই। তাই আমরা ওয়াইস ফান্ডের পুরা টাকা চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়।”
জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন-“আমাদের মাদারগঞ্জের মাটির যে নেচার, সেটা একটু বালি প্রকৃতির। যার কারণে পাড়টা করার পরেও বৃষ্টির সময় পাড়টা ভেঙে গেছে। এখন যদি আমি শ্রমিকদের কাজটা করাই, এরপরে যদি আবার বৃষ্টি হয়, তাহলে কাজটা আবারও ওই মাটির পানিতে মিশে যাবে। যার কারণে যে সরকারের এই অর্থটা, এটা আসলেই মানে মাটির পানিতেই মিশে যেত।”
স্থানীয় অতিদরিদ্র ও বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রকল্পের মোট বরাদ্দের সিংহভাগ অংশ মজুরী খাতে ব্যয় করাটাই ছিলো খাল খনন কর্মসূচীর অন্যতম উদ্দেশ্য। জেলায় খাল খনন কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও হাসিল হয়নি এই প্রকল্পের সকল উদ্দেশ্য। তাই আগামীতে আরো সুনিপুণ পরিকল্পনা গ্রহনের দাবি সচেতন ব্যক্তিদের। আর বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা বলছে জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা।
জামালপুর জেলা কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন- “যদি এই পরিকল্পনা সুনিপুণভাবে করা হয় এবং ধাপে ধাপে খাতওয়ারী বাজেটটা বরাদ্দ করা হয় এবং স্থানীয় যে প্রতিনিধি বা কমিউনিটির, এদের মতামত, এদের সম্পৃক্ত করাটাও একটা জরুরী। তো আমি মনে করি এটা করলে সরকারের লক্ষ্য সফল হবে। আর একটি প্রকল্পে সরকারের কয়েকটি উদ্দেশ্য থাকে। এখানে শুধু খাল খননের উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে। আর কোনো উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি।”
এসব বিষয়ে জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহেল কাফি মোবাইল ফোনে বলেন- “সব জায়গার মাটি যে এক হবে না, এটা তো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ সারা বাংলাদেশের সব মানুষই জানে। তাই না? সব বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলছি। এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত যেভাবে দিবে, আমরা ঐভাবেই বাস্তবায়ন করব।”




