ঈদ সালামি নিতে দপ্তরে দপ্তরে কার্ডধারী সাংবাদিকদের দৌরাত্ম
স্টাফ রিপোর্টার: পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জামালপুর জেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে বেড়েছে কথিত বা নামধারী ‘কার্ডধারী সাংবাদিকদের’ আনাগোনা। অভিযোগ উঠেছে, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন অফিসে গিয়ে ‘ঈদের সালামি’ দাবি করছেন। এতে করে দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম অস্বস্তি ও হয়রানির মধ্যে পড়ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- গলায় ঝোলানো একটি সাংবাদিকতার কার্ড, হাতে স্টিকার লাগানো মোবাইল ফোন এবং কখনো ক্যামেরা নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি অফিস, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এসব ব্যক্তি। নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তারা দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করে ঈদের সালামি দাবি করেন।
অভিযোগ রয়েছে- অনেক ক্ষেত্রে সালামি পাওয়ার আশায় তারা কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত অফিসে বসে থাকেন। প্রথমে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বা প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে খুঁজে বের করেন। এরপর বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন। কেউ প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থ দিতে অনাগ্রহ দেখালে তাদের বিরুদ্ধে ‘নিউজ করা হবে’ বলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে- ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের সময় জামালপুরের একটি সরকারি দপ্তর থেকেই সালামির নামে অন্তত ৮৪ জন সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি এক লাখ টাকারও বেশি অর্থ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠে। বিষয়টি তখন স্থানীয় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামালপুরের একটি প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন-“ঈদ এলেই এসব কার্ডধারীদের অত্যাচার শুরু হয়ে যায়। তারা অফিসে এসে নানা ধরনের কাগজপত্র দেখতে চায়। সব কাগজ তো সবসময় প্রস্তুত থাকে না। একটু সময় চাইলে উল্টো নানা ধরনের কথা বলে। কাজ করার সময় অনেক ডিস্টার্ব করে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দুই-একশ বা পাঁচশ টাকা দিয়ে বিদায় করতে হয়।”
জেলার আরেকটি দপ্তরের এক প্রকৌশলী জানান- “প্রতিটি ঈদের সময় কমপক্ষে শতাধিক কার্ডধারী সাংবাদিক আসে। তারা সরাসরি ঈদের সালামি দাবি করে। না দিতে চাইলে অশোভন আচরণ করে। তখন আমরা খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ি। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম রনি বলেন-“ঈদ এলেই কিছু লোক সাংবাদিকতার কার্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে চাঁদাবাজি করে। ভূমি অফিস, পিআইও অফিসসহ প্রায় সব সরকারি দপ্তরেই তারা যায়। ২০০ টাকা থেকে তাদের চাঁদাবাজি শুরু হয়। আমরা স্থানীয় সাংবাদিকরা এদের কাউকেই চিনি না। ঈদের সময় হঠাৎ করেই এদের দেখা যায়। তাদের কর্মকান্ডে আমরা লজ্জিত ও বিব্রত।”
প্রেসক্লাব জামালপুরের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন- “ঈদ এলেই এসব কার্ডধারী ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়। এদের ছায়া দেয় জামালপুরের একটি প্রেসক্লাব। প্রতিটি দপ্তরে এমন ব্যক্তিদের প্রতিহত করা উচিত। কেউ সালামির কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানো প্রয়োজন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা প্রশাসনের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত।”
জামালপুরের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন- “প্রতিটি ঈদের আগে আমরা এ ধরনের চাঁদাবাজ কার্ডধারী সাংবাদিকদের অত্যাচারের কথা শুনি। তারা ঈদ সালামির নামে বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে টাকা আদায় করে। মূলধারার প্রকৃত সাংবাদিকরা কখনো এমন অনৈতিক কাজ করেন না। যদি কোনো কার্ডধারী ব্যক্তি এভাবে চাঁদাবাজি করে, তাহলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী দপ্তর গুলোকে সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত।”
এ বিষয়ে জামালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন- “আমি তো এখানে নতুন এসেছি। তাই এই বিষয়টি এখনো জানি না। যদি আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করে বা ঘটনার সময় কেউ ফোন করে, তাহলে আমি প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবো। আর যেহেতু আপানারও এই পেশায় আছেন। তাই আপনারাও আমাকে জানাতে পারেন।”




