এক পয়সার অনুদানে শুরু হওয়া শতবর্ষী ঝাড়কাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

এম আর সাইফুল, মাদারগঞ্জ: এক ভবঘুরে নারীর দেওয়া এক পয়সার অনুদান থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের। সময়ের স্রোত পেরিয়ে শতবর্ষের পথচলায় বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি গড়ে তুলেছে অসংখ্য আলোকময় জীবন। পাঁচ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এখন চরপাকেরদহ ইউনিয়নসহ পুরো উপজেলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
১৯০৭ সালে মাইনর স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি ১৯৫৯ সালে প্রথমবারের মতো মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেয়। দীর্ঘ যাত্রায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেরিয়ে আসা বহু শিক্ষার্থী আজ প্রশাসন, সেনাবাহিনী, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সফলতার সঙ্গে অবদান রাখছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধেও এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।
বিদ্যালয়টির সৃষ্টির মূলে রয়েছে স্থানীয়দের ত্যাগ ও অনুদান। লোকমুখে প্রচলিত, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম বৈঠকে ‘ক্যাশো পাগলী’ নামে এক ভবঘুরে নারী তাঁর কাছে থাকা একমাত্র এক পয়সা দান করে এই স্থানেই স্কুল গড়ার আকুতি জানান। সেই আবেগ থেকেই উৎসাহ পান স্থানীয়রা। পরবর্তীতে মোবারক সরকার, লোকমান সরকার, মোহাম্মদ আলী, সাবেত চেয়ারম্যান, সেকান্দর আলী চৌধুরী, আজগর সরকার, মোফাজ্জল, আলতাফ হোসেন, আব্দুস সামাদ ও ঘেতা সরকারসহ এলাকার বহু মানুষ জমি ও অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়টির ভিত্তি মজবুত করেন।
ময়মনসিংহের আবুল হোসেন ছিলেন এর প্রথম প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সচিব কামরুল হাসান কমল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আব্দুল হালিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আকিল আহমেদ, বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক Federation-এর সাধারণ সম্পাদক মোকাদ্দেম হোসেন, সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল মোস্তাকিম বিল্লাহ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. কবিরুল হাসান বিন রকীব ও ডা. মেহেদী হাসান এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম হারাই। এছাড়া শতাধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ১৩ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী নিষ্ঠার সঙ্গে এটি পরিচালনা করছেন। দুটি তিনতলা ও একটি একতলা ভবন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ নিয়ে চলছে এর শিক্ষা কার্যক্রম।
২০২৬ সালে এ বিদ্যালয় থেকে ৪২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোঃ নজমুল হক বলেন, এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এ অঞ্চলের গর্বের নাম। আধুনিক শিক্ষার সাথে তাল মিলিয়ে এর ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা জরুরি।
প্রধান শিক্ষক শাহ মো. আনিছুর রহমান জানান, শতবর্ষের গৌরব ধরে রেখে শিক্ষার মান ও সহশিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। এক পয়সার ক্ষুদ্র স্বপ্ন থেকে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ মহীরুহ হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলো জুগিয়ে চলেছে।




