জামালপুরে পাউবোর ১.৮ কোটির প্রকল্পের ঠিকাদার অজ্ঞাত: নেপথ্যে প্রকৌশলী থাকার সন্দেহ
এম আর সাইফুল,মাদারগঞ্জ: জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবউজ্জামান খানের বিরুদ্ধে নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে স্থানীয় ঠিকাদারদের বঞ্চিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাজ না পাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য তৈরি হয়েছে কার্যাদেশ পাওয়া টাঙ্গাইলের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। স্থানীয়দের অভিযোগ- কাগজে-কলমে টাঙ্গাইলের প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও, মূলত ওই দুই ব্যানারে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই নেপথ্যে থেকে এই সরকারি কাজ পরিচালনা করছেন।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের পাকরুল এলাকায় নদী ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপনের কাজ চলছে। ৬টি প্যাকেজের আওতায় ১৮০ মিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নির্বাহী প্রকৌশলী তাঁর পছন্দের টাঙ্গাইল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মোল্লা ট্রেডার্স’ ও ‘আমিন ট্রেডিং কর্পোরেশন’-কে এই কার্যাদেশ দিয়েছেন।
সম্প্রতি সরেজমিন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়- সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজের বিবরণ সংবলিত কোনো তথ্যবোর্ড বা সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়নি। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বশীল প্রতিনিধি বা প্রকৌশলীকেও পাওয়া যায়নি। তবে মাঠে উপস্থিত উপসহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক জানান- ঠিকাদারের পক্ষে লাজু নামের এক ব্যক্তি কাজ তদারকি করছেন।
পরবর্তীতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে লাজু নিজে কোন প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছেন, তা জানাতে পারেননি। তিনি দাবি করে বলেন-“সৈকত নামের এক ব্যক্তি আমাকে টাকা দেন। সেই টাকা দিয়েই আমি শ্রমিক খাটানোর মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করছি।”
কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্থানীয় বাসিন্দা রাষ্ট্রদূত বলেন- “কোথাকার কোন ঠিকাদার কাজ করছে, তা আমরা কেউ জানি না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকেই কোনোদিন এলাকায় দেখা যায়নি। কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং কোনো তদারকি নেই। প্রতিটি জিও ব্যাগে প্রাক্কলনের অর্ধেকেরও কম বালু ভরা হচ্ছে, যা নদীর তীব্র স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।”
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন-“কাজের উদ্বোধনের সময় এলাকার মানুষের প্রত্যাশা ছিল জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল প্রকল্পটির উদ্বোধন করবেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়নি।”
এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান রতন বলেন- “বিভিন্ন মাধ্যমে এই কাজে অনিয়মের কথা শুনছি। প্রকল্প উদ্বোধনের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য কিংবা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ-কাউকেই অবহিত করা হয়নি। বহিরাগত ঠিকাদার দিয়ে গোপনে কাজ করানোর এই পুরো বিষয়টি নিয়ে আমি সংসদ সদস্য মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলব।”
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বেনামী ঠিকাদারি ও অনিয়মের সব অভিযোগ অস্বীকার করে জামালপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবউজ্জামান খান বলেন- “ স্থানীয় ঠিকাদারদের এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করার মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা (লিকুইডিটি) নেই। এসব কাজ আগে নিজেদের তহবিল থেকে করতে হয়, বিল পাওয়া যায় পরে। স্থানীয়রা কাজ পাওয়ার জন্য নয় বরং চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে এই ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত করার চেষ্টা করছেন।”
তবে কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান দুটির নাম উল্লেখ করলেও রহস্যজনক কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বত্বাধিকারীদের নাম কিংবা কোনো যোগাযোগ নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানান এই কর্মকর্তা।
শুধু এই কাজ নয়, টাঙ্গাইলের সেই দুই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এর আগেও জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েক কোটি টাকার ঠিকাদারী কাজ করেছেন বলে জানা যায়।




