মাদারগঞ্জপ্রধান খবর

মিল্ক ভিটা ঘিরে উত্তেজনা: চাঁদাবাজির অভিযোগ বনাম ভেজাল দুধের জিডি

এম আর সাইফুল,মাদারগঞ্জ: জামালপুরের মাদারগঞ্জে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নকে (মিল্কভিটা) ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

একদিকে এক খামারি মিল্কভিটার উপব্যবস্থাপকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট ও মারধরের লিখিত অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে ওই খামারির বিরুদ্ধে ভেজাল দুধ তৈরির উপকরণ রাখার অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে কর্তৃপক্ষ।

এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও ভেজাল দুধ সরবরাহের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সর্দারপাড়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ও খামারি সাধন ঘোষ চাঁদাবাজির এই অভিযোগ দায়ের করেন। তার দাবি, গত ২৭ জুলাই মিল্কভিটার মাদারগঞ্জ দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের উপব্যবস্থাপক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. মো. মঞ্জুরুল হাসান কয়েকজনকে নিয়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করেন। এ সময় তার কর্মচারী নয়ন চন্দ্র ঘোষকে মারধর করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাত লাখ নগদ টাকা, ৭০ হাজার টাকার মালামাল এবং ৩৫০ লিটার দুধ লুট করা হয়। এর আগে আলি, সায়েম ও সায়েদ নামের তিন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক প্রতিদিন ৬০ লিটার দুধ সরবরাহের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন এবং রাজি না হওয়ায় ভয়ভীতি দেখাচ্ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই ঘটনার জেরে ২৯ জুলাই মাদারগঞ্জ মডেল থানায় তিনি একটি লিখিত অভিযোগ দেন।

তবে অভিযুক্তরা এসব দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। সমবায়ী আলি মন্তব্য করেন, তাকে শুধু সাক্ষী হিসেবে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ লিটার সন্দেহভাজন ভেজাল দুধ, জেলি ও একটি মোটর পাওয়া যায়, যা পরে নষ্ট করা হয়। যদিও অনুসন্ধানে জানা যায়, আলির নিজস্ব কোনো খামার বা গরু নেই। তিনি মূলত অগ্রিম টাকার বিনিময়ে অন্যদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে সরবরাহ করেন।

অন্যদিকে ডা. মো. মঞ্জুরুল হাসান লুটপাটের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে জানিয়েছেন, খামার পরিদর্শনের সময় ভেজাল দুধ তৈরির জেলি ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি কোনো দুধ নষ্ট বা মোটর জব্দের কথা অস্বীকার করেন।

পুরো ঘটনায় উপব্যবস্থাপকের কার্যক্রমে বেশ কিছু অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। ভেজাল দুধের উপকরণ পাওয়ার পরও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে জানাননি। উল্টো ঘটনার দুই দিন পর তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে অভিযানের অনুরোধ করেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতিকুর রহমান তার ভাষ্যে তুলে ধরেন, এমন উপকরণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে জানানো উচিত ছিল, যাতে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরীও নিশ্চিত করেছেন, জব্দের বিষয়ে প্রশাসনকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।

স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, মাদারগঞ্জ মিল্কভিটায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। উপজেলায় নিবন্ধিত ১১টি সমিতির বাইরেও অনিবন্ধিত সমবায়ের মাধ্যমে দুধ নেওয়ায় প্রকৃত খামারিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

ডা. মঞ্জুরুল হাসানও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমানে ১৭টি সমবায়ের কাছ থেকে দুধ নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে অনিবন্ধিত সমিতিও রয়েছে।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভেজাল দুধের অভিযোগে মাদারগঞ্জ শীতলীকরণ কেন্দ্রটি এর আগেও কয়েকবার সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। বর্তমানে এখানে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়।

মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় জানিয়েছেন, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং ভেজাল দুধ সংক্রান্ত জিডি উভয় বিষয়ই তদন্তাধীন রয়েছে। তবে খামারি সাধন ঘোষ অভিযোগ করলেও বর্তমানে তিনি আর কোনো আইনি সহায়তা চাইছেন না বলে এই পুলিশ কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।

Related Articles

Back to top button