বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সাক্ষী কাচারি ঘর
এম আর সাইফুল, মাদারগঞ্জ: একসময় জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার গ্রামবাংলার সামাজিক, প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র ছিল ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর। এখানেই বসত গ্রামের বিচার-সালিশ, জমিজমার বিরোধ নিষ্পত্তি, খাজনা আদায় এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আসর। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে মাতবরদের প্রজ্ঞা আর অসংখ্য স্মৃতির সাক্ষী এসব ঘর আজ বিলুপ্তির পথে। কালের বিবর্তনে অযত্ন ও অবহেলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে গ্রামীণ সভ্যতার এই গৌরবময় নিদর্শন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়- অধিকাংশ কাচারি ঘরের টিনের চাল খসে পড়েছে এবং ভেঙে গেছে কাঠের কাঠামো। কোথাও কোথাও এসব ঘর গবাদিপশু রাখার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রিটিশ থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত এসব ঘরেই খাজনা আদায় ও জমিজমার দলিলপত্র রচনা হতো। সমাজের সম্মানিত মাতবরদের উপস্থিতিতে এখানেই নেওয়া হতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা গ্রামীণ সমাজে শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখত।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুর কাদের বাবুল খান মন্তব্য করেন-“বাপ-দাদার আমলে দেখেছি মাতবররা কাচারি ঘরে বসে বিচার করতেন। জমি নিয়ে কোনো বিরোধ হলে সবাই এখানেই আসত, অথচ এখনকার প্রজন্ম এসবের নামও জানে না।”
নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত অনেক সামর্থ্যবান পরিবারের বাড়িতে কাচারি ঘর ছিল এবং সেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ‘জাগির’ হিসেবে রাখা হতো বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, সরকার উদ্যোগ নিলে অন্তত আমাদের এই অমূল্য ইতিহাস বেঁচে থাকত।
রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেও এই অঞ্চলের কাচারি ঘরের বিশেষ পরিচিতি ছিল বলে তুলে ধরেন স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল তালুকদার। তিনি জানান, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ও এমপিএ বফাত উদ্দিন তালুকদারের সময়ে কাচারি ঘরে সে সময়ের অনেক খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ১৯৯০ সালে আলতাফুর রহমান তালুকদারের মৃত্যুর পর কাচারি ঘরটি ধীরে ধীরে তার জৌলুশ হারাতে শুরু করে বলে তিনি স্মৃতিচারণ করেন। তবে বর্তমানে তার তৃতীয় প্রজন্ম ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ঘরটি সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে স্কুলশিক্ষক মো. খায়রুজ্জামান খান মনে করেন, “কাচারি ঘর শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ শাসনব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। এগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন প্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারা ও সামাজিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হারাবে।”
অন্যদিকে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই মূল্যবান নিদর্শন সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আনা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন সাবেক মেয়র মোশাররফ হোসেন লেমন তালুকদার।
ইতিহাসবিদদের মতে, কাচারি ঘর একটি জনপদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি কাচারি ঘর ভেঙে পড়ার অর্থ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনার বিলীন হওয়া নয়, বরং একটি জনপদের শেকড় চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের আত্মপরিচয় ও গ্রামীণ সভ্যতার উজ্জ্বল অধ্যায় তুলে ধরতে এসব স্থাপনা সংরক্ষণে দ্রুত সরকারি ও সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।




