গারো পাহাড়ে বন উজাড় ও জলবায়ুর প্রভাব
১২ বছরে ৪৯ জন মানুষ ও ৩৫টি হাতির মৃত্যু
স্টাফ রিপোর্টার: পাহাড়ে এখন আর সময়মতো বৃষ্টি হয় না। শুকিয়ে গেছে প্রাকৃতিক ঝিরি বা ঝরনাগুলো। অবাধে গাছ নিধন ও পাহাড় কাটার ফলে বনের ভেতর হারিয়ে গেছে হাতির প্রধান খাবার আমলকী, হরিতকী, বহেড়া বা বুনো কলার গাছ। ফলে চরম খাদ্য ও পানির সংকটে পড়ে গারো পাহাড়ের বন্য হাতির দল বেঁচে থাকার তাগিদে গত দুই দশক ধরে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এতে জামালপুর ও শেরপুরসহ আশপাশের সীমান্ত এলাকায় হাতি ও মানুষের মধ্যে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাত বেড়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন মানুষ এবং মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও বিষটোপে মারা গেছে ৩৫টি বুনো হাতি।
গত এক যুগের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শেরপুর জেলায়। সেখানে হাতির আক্রমণে ৩০ জন মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি সমানসংখ্যক হাতিরও প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া ময়মনসিংহে ১০ জন মানুষ, নেত্রকোনায় ৫ জন মানুষ ও ২টি হাতি এবং জামালপুরে ৪ জন মানুষ ও ৩টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
শুধু ২০১৫ সালেই চার জেলায় সর্বোচ্চ ৭টি হাতির করুণ মৃত্যু ঘটেছিল।
একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাবার এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু বনের ভেতরের ঝিরিগুলো মরুভূমিতে পরিণত হওয়ায় এবং চলাচলের আদিম পথগুলো বেদখল হওয়ায় তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত হাতির দল দিকভ্রান্ত হয়ে সমতলে নেমে আসছে। ফসলের খেত ও ঘরবাড়ি বাঁচাতে সীমান্ত এলাকার মানুষ জিআই তার দিয়ে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতছে, যার ফলে ঘটছে হাতির মর্মান্তিক মৃত্যু।
গত ১০-১৫ বছর ধরে হাতির লোকালয়ে আসার প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
পাহাড়ের বাসিন্দা জয়দাঙ্গো এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন- “১৫ বছর থাইক্যা হাতি এলাকাতে আসে। এর আগে হাতি পাহাড়ের ভেতরেই থাকছে। পাহাড়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার নাই। আগে কলাগাছ, আমলকী, হরিতকী, বহেড়ার মতো বনের কিছু গাছ ছিলো। সেসময় হাতি পাহাড়ের ভেতরেই থাকছে। এখন আমরা যখনি ফসল লাগাই তখন আসে, আবার ঘরে ফসল তোলার সময় নিয়া যায়।”
সীমান্তবর্তী বালিজুরী এলাকার কৃষক রমজান আলী তার ভাষ্যে তুলে ধরেন- “হাতির কোনো দোষ নাই ভাই, বনের ভেতর ওদের পেটের ভাত আর তৃষ্ণার পানি নাই, ওরা জংলা ছেড়ে সমতলে নামব না তো কই যাইব? কিন্তু ওদের ঠেকাতে গিয়ে মানুষ বিদ্যুতের তারের ফাঁদ পাতে, মশাল নিয়ে তাড়া করে, তখন দেখা যায় হাতি মারা যায়। আবার হাতি ক্ষেপে গেলে মানুষের জান যায়। আমরা এই হাতি-মানুষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বাঁচতে চাই।”
হাতির তাণ্ডবে সর্বস্বান্ত হওয়া কৃষক মো. আবদুর রশিদ আক্ষেপ করে মন্তব্য করেন, হাতির দল লোকালয়ে নামলে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। ধারদেনা করে লাগানো ফসল পাকার ঠিক আগ মুহূর্তে হাতির দল এসে পুরো খেত মাড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। সরকারের কাছে ফসলের নিরাপত্তা এবং বনের ভেতর হাতির খাবারের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে বনের খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস করছে, সে বিষয়ে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রাণীবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রোকোনুজ্জামান বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে না, আর বৃষ্টি না হলে পাহাড়ে গাছপালা জন্মাবে না। পাহাড়ের নদীর প্রবাহ বা ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় হাতি পানির সংকটে পড়ছে। বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল হাতির খাবার উপযোগী গাছগুলো খরার কারণে আর জন্মাচ্ছে না। পাহাড়ের এই রুক্ষ পরিবেশের কারণেই তারা বাধ্য হয়ে সমতলের দিকে চলে আসছে।
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বালিজুরী রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে, যার জন্য বনের বর্তমান পরিবেশ মোটেও অনুকূল নয়।
ময়মনসিংহ বিভাগের বালিজুরী রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া জানিয়েছেন, সংঘাত কমাতে বনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বালিজুরী রেঞ্জের প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাহাড়ের পানির সংকট দূর করতে হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন বনভূমিতে ৪০টির মতো কৃত্রিম জলাধার বা লেক তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, বনের ভেতর হাতির প্রিয় খাবার বুনো কলা, বাঁশ, আমলকী ও কাঁঠাল গাছের নিবিড় বনায়ন এবং গভীর লেক তৈরি করা জরুরি।




