জামালপুরপ্রধান খবর
জামালপুরে অসহনীয় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন
স্টাফ রিপোর্টার: জামালপুর জেলায় তীব্র গরম ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেই বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং, যা জনজীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর আওতায় লোডশেডিং তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে শহরের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেশি। দূর্গম চরাঞ্চলে দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না।গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ কখন আসবে আর কখন যাবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে নষ্ট হচ্ছে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্য, ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। বিদ্যুৎ না থাকায় গভীর নলকূপ ও পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না, ফলে অনেক এলাকায় পানি সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।
শহর ও গ্রামের ব্যবধান ভুলে বিদ্যুতের এই অনিয়মিত সরবরাহ জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
জামালপুর শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা শহীদ হারুন সড়কের বাসিন্দা বিপ্লব বলেন-“আমার বাসার নিচে দোকান আছে। প্রতিদিন বিকেল বা সন্ধ্যার সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ব্যবসার মূল সময়েই লোডশেডিং হয়, এতে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।”
বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের দিঘলাকোনা পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা রাত্রি দারিং বলেন- “আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। বাকি সময় লোডশেডিং থাকে। বিদ্যুৎ থাকলেও না থাকার মতো। বিশেষ করে বাচ্চাদের খুব কষ্ট হয়। রাতে বিদ্যুৎ থাকলে অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম।”
মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব পাঠানপাড়া গ্রামের কৃষক আকবর আলী বলেন- “লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষিকাজে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালানো যায় না। আবার ডিজেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়, ফলে সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হয় না।”
মাদারগঞ্জ উপজেলার ঝাড়কাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হারিস বলেন, “বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রেণিকক্ষে পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠছে।”
সরিষাবাড়ি উপজেলার পোগলদিঘা ইউনিয়নের বয়ড়া বাজার এলাকার ইজিবাইক চালক মনিরুজ্জামান তালুকদার কিনু বলেন- “১২ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। রাতে লোডশেডিং আরও বেশি হয়। ঠিকমতো ব্যাটারি চার্জ করতে না পারায় গাড়ি চালাতে পারি না, ফলে আয়ও কমে গেছে।”
ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী চরাঞ্চলের শিক্ষার্থী মেহরাব জানান- “আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ প্রায় থাকেই না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ ২-৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। রাতে পড়াশোনা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।”
জামালপুরের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন- “জামালপুরসহ আশপাশে থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে এই সংকট অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলো দ্রুত চালু করতে হবে। সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এছাড়াও অঞ্চল ভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সময় নির্ধারন করলে সকলে প্রস্তুত থাকবে। এতে দূর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে।”
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়- চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ সাহিদুল ইসলাম জানান, জেলার সাতটি উপজেলা ছাড়াও শেরপুর জেলা, কুড়িগ্রামের রাজিবপুর ও রৌমারী এবং সিরাজগঞ্জের কিছু এলাকা নিয়ে এই সমিতির আওতায় গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার। এই বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে দৈনিক ১৫০-১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০-৬০ মেগাওয়াট।
তিনি বলেন- “চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় গড়ে ৬০-৬৫ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামে এবং দিনের তুলনায় রাতে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। শহরে গড়ে ৭-৮ ঘণ্টা এবং গ্রামে এর চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মহিবুল আজাদ রুবেল জানান- জামালপুর শহর, সরিষাবাড়ি, ইসলামপুর ও মেলান্দহ উপজেলার কিছু অংশে মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৭৮ হাজার। এই গ্রাহকদের জন্য দৈনিক ৩০-৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০-২২ মেগাওয়াট।
তিনি বলেন- “চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আমরা নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাচ্ছি। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে লোডশেডিং অনেকটাই কমে আসবে।”
সবমিলিয়ে গরম, জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুতের অপ্রতুল সরবরাহ একসঙ্গে মিলে জামালপুরের জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।




