জাতীয়প্রধান খবর

ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪ বছরে তাপমাত্রা বেড়েছে ১ ডিগ্রির বেশি

স্টাফ রিপোর্টার: জামালপুরসহ পুরো ময়মনসিংহ বিভাগেই প্রতি বছর আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে তাপমাত্রা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৪ বছরে এ অঞ্চলে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক শূন্য ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৫ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগের গড় তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ক্রমাগত এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। জলবায়ু বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট নানা কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে- ২০১১ সালে এ অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৬৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৯০ ডিগ্রিতে। ২০২৪ সালে সামান্য কমে ৩০ দশমিক ৫২ ডিগ্রি হলেও সর্বশেষ ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে ৩০ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়।

এই টানা তাপপ্রবাহে জনজীবন ও প্রাণিকুলে নেমে এসেছে চরম অস্বস্তি। কাজের প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া জামালপুর শহরের বাসিন্দা রিফাত মোল্লা আক্ষেপ করে বলেন- ‘প্রচ- গরমে কোথাও একটু বসে জিরিয়ে নেওয়ার মতো জায়গাও এখন আর নেই। শহরের তাপমাত্রা যেন আরও বেশি। বাধ্য হয়েই রোদের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। এমন গরম আগে ছিলো না। দিন দিন রোদের তাপ বাড়ছে।’

তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও জীবন-জীবিকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুক বলেন- ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মানবস্বাস্থ্য, কৃষি, পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র, শিল্প ও অর্থনীতিতে বিস্তর প্রভাব পড়ছে। আমরা বহুতল ভবন নির্মাণ ও শিল্পায়ন করছি, কিন্তু সেখানে ‘হিট সেনসিটিভ প্ল্যানিং’ বা তাপ-সংবেদনশীল পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। যানবাহনের সংখ্যা কমানো, জ্বালানি নির্ভরতা হ্রাস এবং কৃষিতে ক্লাইমেট স্মার্ট প্র্যাকটিস অগ্রাধিকার দিলে তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব।’

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মৃণাল কান্তি চৌধুরী বলেন- ‘গাছপালা কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নির্বিচারে জলাশয় ভরাটের কারণেই তাপমাত্রা বাড়ছে। জলাশয়ের পরিমাণ বাড়াতে না পারলে তাপমাত্রা আরও এক থেকে দুই ডিগ্রি বেড়ে যেতে পারে, যা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক।’
একই বিভাগের প্রভাষক ইশরাত জাহান ইভা বলেন- ‘প্রকৃতিকে তার নিজের মতো থাকতে না দিয়ে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছি। এর ফলেই অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের কৃষিতে। চারপাশ কেবল কংক্রিট দিয়ে না ঢেকে আমাদের সবুজ পরিবেশের দিকে ধাবিত হতে হবে।’

পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য বিভাগ নানা পরামর্শ ও উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা জানান- বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ইটভাটা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। যত্রতত্র এসব যেন পরিবেশ দূষণ করতে না পারে, সে বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করছে।

গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান সোহান সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছেন। ডা. সোহান বলেন- ‘তীব্র গরমের সময়ে প্রচুর পরিমাণ পানি, ডাবের পানি বা স্যালাইন পান করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া রোদে বাইরে বের না হওয়া, বাইরে গেলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করা এবং কিছুক্ষণ পরপর শরীর মুছে নেওয়া জরুরি।’

সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন- এখনই সঠিক ও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ২০৩০ সাল নাগাদ ময়মনসিংহ অঞ্চলের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ৩১ দশমিক ০৬ থেকে ৩১ দশমিক ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকতে পারে।

Related Articles

Back to top button