’এ’ নেগেটিভ রক্তধারী শিশুর শরীরে ‘ও’ পজেটিভ রক্ত প্রয়োগ করলো নার্স
স্টাফ রিপোর্টার: নার্সের গাফিলতির কারনে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আফসানা আক্তার (১৪) নামের এক রোগীর শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় লিখিত অভিযোগের পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এই ঘটনা ঘটে।
রোগী আফসানা আক্তার (১৪) শেরপুর সদর উপজেলার মোকসেদপুর এলাকার আনিসুর রহমানের মেয়ে। তাঁর নানার বাড়ি জামালপুর পৌর শহরের কম্পপুর এলাকায়। সে নারায়নগঞ্জের রূপসী এলাকার নিউ মডেল নামের একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং তাঁর বাবা পেশায় একজন কৃষক।
রোগী আফসানার মামা আবির হাসান জানান- পেটে ব্যাথার কারনে গত কয়েকদিন আগে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয় আফসানা। গতকাল অপারেশনের পর আফসানাকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে রাখা হয়। পরে বিকেলে প্রয়োজন না হলেও এবং পরিবারের বাধার পরেও আখি নামের একজন নার্স ‘এ’ নেগেটিভ ধারী আফসানার শরীরে ‘ও’ পজেটিভ রক্ত প্রয়োগ করে। এর কিছুক্ষন পর বিষয়টি বুঝতে পেরে রক্ত দেয়া বন্ধ করে দেয় নার্স আখি। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে আফসানাকে চিকিৎসা প্রদান করা শুরু করে চিকিৎসকেরা।
রোগীর মামা আবির হাসান বলেন- “কয়েকদিন আগে আমার ভাগ্নির পেটে ব্যথা অনুভব করে। কোনোভাবেই ব্যথা কম ছিলো না। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা থেকে জামালপুরে নিয়ে আসা হয়। গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসককে দেখানো হলে তিনি পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বলেন, কিডনিতে ময়লা জমতে পারে। আপনারা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে ওই দিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক বেশকিছু পরীক্ষা নিরিক্ষা দেন। সেই সব পরীক্ষাগুলো বাইরে থেকে করানো হয়। সকল পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে আফসানার এপেন্টিসাইড হয়েছে বলে জানান কর্তব্যরত চিকিৎসক। অপারেশন করার কথা বলেন। পরে মঙ্গলবার অপারেশন করানো হয়। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর রক্ত লাগবে সেই ধরনের কোনো কথা বলেননি। কিন্তু অপারেশনের পর নার্স তাকে রক্ত পুশ করতে আসেন। তখন আমার বোন তাকে বাঁধা দেয়। এ সময় নার্স আমার বোনের সাথে খারাপ আচারন করেন এবং জোরপূর্বক শরীরে রক্ত দেয়।
আবির বলেন- “প্রায় আধা ঘণ্টা রক্ত শরীরে যাওয়ার পর দেখা যায় রক্তটি ভিন্ন গ্রুপের। শরীরে যে রক্ত পুশ করা হয়েছে সেটা “ও” পজেটিভ। আর আমার ভাগ্নির রক্তের গ্রুপ “এ” নেগেটিভ। রক্তটি ছিল পাশের বিছানার সিজারের রোগীর জন্য। পরে তার শরীরে রক্ত দেওয়া বন্ধ করা হয়। কিন্তু এটা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ছিল না। আমি এ খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে ভিডিও করে কিছু কথা বলার চেষ্টা করি। তখনও কর্তব্যরত চিকিৎসক বা নার্সরা কেউই বিষয়টা নিয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। এ সময় আমার পরিচিত একজনের কাছ থেকে হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের মোবাইল ফোন নাম্বারটা সংগ্রহ করে রোগীর শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়ার বিষয়টি তাকে জানানো হয়। পরে তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসককে ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বললে তাঁরা আলাদা চিকিৎসার পাশাপাশি নজরদারি শুরু করেন।”
আবির আরো বলেন- “এখন আমার ভাগ্নির শরীরে জ্বর আছে। বমি বমি একটা ভাব রয়েছে। আমি যতটুকু জানি একজন মানুষের শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেয়া হলে তাঁর মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। ভবিষ্যতেও এটার প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। এ ঘটনায় আমি জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। ভবিষ্যতের কথা ভেবে থানাতেও একটি সাধারণ ডায়েরি করে রাখবো। যে নার্সের অবহেলায় আমার ভাগ্নির শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়া হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানায় আমি।”
ভুক্তভোগী রোগীর মা আন্জু আরা বেগম জানান- “আফসানার কোন রক্তের প্রয়োজন ছিল না। রক্তের কোনো কথাও বলেনি চিকিৎসক। হঠাৎ করেই নার্স রক্ত নিয়ে এসে শরীরে দেওয়া শুরু করেন। ডাক্তারতো রক্তের কথা বলে নাই এমন কথা বললে ওই নার্স খারাপ আচারণ করে বলেন আমার চেয়ে বেশি বুঝেন। আমার চেয়ে বেশি বুঝবেন না। এই বলে আমার মেয়ের শরীরে রক্ত দেওয়া শুরু করেন তিনি। ২০ মিলি লিটার রক্ত শরীরে যাওয়ার পর নজরে পড়ে সেই রক্তটি “ও” পজেটিভ। কিন্তু আমার মেয়ের তো রক্তের গ্রুপ “এ” নেগেটিভ। তখন রক্ত দেওয়া বন্ধ করা হয়। এখন তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।”
ঘটনার পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছে আখি নামের সেই নার্স।
তবে এ বিষয়ে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন- “অবজারভেশনে থাকাবস্থায় নার্সের গাফিলতির কারনে ভুলব:শত “ও” পজেটিভ রক্ত দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা জানার পরেই আমরা রক্ত দেওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে তাকে ডাক্তারের অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। এখন রোগীর অবস্থা ভালো আছে। নার্সের গাফিলতির কারনে ওই রোগীর শরীরে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোসায়েদুল ইসলাম সুমনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত করে ওই নার্সের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




