মেলান্দহপ্রধান খবর

একই নারীর দুই মৃত্যু সনদে চাঞ্চল্য: গণস্বাক্ষরেও মিলেছে অসঙ্গতি

সাকিব আল হাসান নাহিদ, মেলান্দহ:  জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের দাগী গ্রামে এক মৃত নারীর দুইটি ভিন্ন মৃত্যু সনদ ইস্যুতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মৃত কুলসুম বেওয়ার মৃত্যুর তারিখ নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর বিভ্রান্তি ও অসঙ্গতি। ১ম মৃত্যু সনদটির তথ্য উল্লেখ নেই ইউনিয়ন পরিষদের নথিতে। আর সঠিক বলে দাবি করা ২য় মৃত্যু সনদটি দেয়া হয়েছে গনস্বাক্ষরের উপর ভিত্তি করে। তবে স্বাক্ষরকারী অনেকেই জানেন না মৃত্যুর সঠিক তারিখ। আর এই মৃত্যু সনদকে কেন্দ্র করে জমি সংক্রান্ত একটি মামলা চলছে আদালতে। যেটি তদন্ত করছে সিআইডি।

জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের দাগী গ্রামের মৃত ইছিন শেখের সন্তান মৃত কুলসুম বেওয়া। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর নয়ানগর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রদান করা মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়- ১৯৮৩ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারনে মারা গেছেন। যার স্মারক নং- নয়া/ইউপি/২০২৫। যেটিতে স্বাক্ষর করেন ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আমিন খান।

অপরদিকে ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি একই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একই ইউপি সদস্যের স্বাক্ষর করা মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়- ১৯৮৬ সালের ১৩ মার্চ বার্ধক্যজনিত কারনে মারা যান কুলসুম বেওয়া। যার স্মারক নং- নয়া/ইউপি/২০২৬/৭১।

নয়ানগর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়- ইউনিয়ন পরিষদের রেজিস্টার অনুযায়ী, ৭১ নম্বর সিরিয়ালে কুলসুম বেওয়ার মৃত্যু সাল ১৯৮৬ উল্লেখ রয়েছে এবং তার ভাতিজা বাচ্চু মিয়া সনদটি গ্রহণ করেন। তবে ১৯৮৩ সালের মৃত্যু সনদটির কোনো তথ্য নেই পরিষদের নথিতে।

একই ব্যক্তির দুই মৃত্যু সনদে স্বাক্ষর করা ইউপি সদস্য আমিন খানকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন-“১৯৮৩ সালের মৃত্যু সনদটি পরিচিত ব্যক্তির কথায় রাস্তায় স্বাক্ষর করেছি। পরে ১৯৮৬ সালের সনদটি সঠিক বলে গণস্বাক্ষরের ভিত্তিতে স্বাক্ষর করি।”

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়- দ্বিতীয় মৃত্যু সনদের পক্ষে একটি প্রত্যয়ন পত্রে ১৯৮৬ সালের তারিখকে “সঠিক ও নির্ভুল” দাবি করে ৫০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তির গণস্বাক্ষর নেওয়া হয়।

তবে এই গণস্বাক্ষর নিয়েই উঠেছে নানা প্রশ্ন। তালিকাভুক্ত ৫০ জনের মধ্যে ২৭টি মোবাইল নম্বর যাচাই করা হয়েছে। মাত্র দুইজন ১৯৮৬ সালে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অপরদিকে দুলাল মন্ডলসহ বেশ কয়েকজন স্বাক্ষরকারী জানান- তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

গনস্বাক্ষরে স্বাক্ষর করা মোহাম্মদ জুয়েল, মোঃ হাসান, বেলায়েত হোসেন, বাবুল, ইসাহাক ও সাজেদুল ইসলামসহ অনেকেই দাবি করেন- জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক সাল সম্পর্কে তারা অবগত নন।

গণস্বাক্ষরকারীদের একজন মোঃ শাহিন (২১) বলেন- “কুলসুম বেওয়া কবে মারা গেছেন, আমি দেখিনি।”

এতে গণস্বাক্ষরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ- মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে একই ব্যক্তির নামে দুইটি ভিন্ন মৃত্যু সনদ প্রদান এবং গণস্বাক্ষরে অসত্য তথ্যের উপস্থিতি প্রশাসনিক গাফিলতি ও অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

মৃত কুলসুম বেওয়া’র ছোট ছেলে মৃত আব্দুল লতিফের সন্তান মো: আব্দুল্লাহ বলেন- “আমাদের জমি নিয়ে একটি মামলা আদালতে চলমান আছে। যেটি তদন্ত করছে সিআইডি। সেই মামলায় ঢাল হিসেবে ১৯৮৬ সালের ভূয়া মৃত্যু সনদটি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা সবাই ঢাকা থাকি। তাই আমাদের প্রতিপক্ষ সহজেই এই কাজটি করতে পেরেছে।”

মো: আব্দুল্লাহ আরো বলেন-“মৃত কুলসুম বেওয়া ১৯৮৩ সালে মারা গেছেন। আমি তার নাতি। এটা আমার চেয়ে আর ভালো কে জানবে? যারা গনস্বাক্ষরে স্বাক্ষর করেছে তাদের অনেকেই ১৯৮৬ সালে জন্মগ্রহনই করেনি। এতেই প্রমানিত হয় যে ১৯৮৬ সালের মৃত্যু সনদটি ভূয়া।”

১৯৮৬ সালের মৃত্যু সনদ নেয়া কুলসুম বেওয়া’র স্বজনদের মধ্যে সুরুজ শেখ (সাত্তার) নামে একজন মোবাইল ফোনে বলেন- “আসলে সে সময় কেউ তো সময় মনে রাখেনি। তবে ১৯৮৬ সালে মারা গেছে।”

গনস্বাক্ষরে স্বাক্ষর করা ২৭ জন মৃত্যুর সময় জানে না, এমন প্রশ্ন করা হলে সুরুজ শেখ কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে তিনি বলেন-“এতো পুরাতন ঘটনা অনেকেরই মনে নেই। তাই হয়তো ভুলে গেছে। কারন ২০০০ সালের পর থেকে মৃত্যু সনদের চাহিদা বাড়ে। তার আগে মৃত্যু সনদের কোনো চাহিদা ছিলো না।”

আদালতে জমি নিয়ে চলা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জামালপুর সিআইডির উপ-পরিদর্শক খায়রুল বলেন- “আমি এই মামলাতে তদন্ত করে যা পেয়েছি। তা আমি আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করবো। এর আগে গনমাধ্যমে কিছু বলা সঠিক হবে না।”

নয়ানগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শবনম মোস্তারি মুঠোফোনে বলেন- “বিষয়টি আমার যোগদানের আগের হতে পারে। আমি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয় গুরুত্ব সহকারে যাচাই-বাছাই করে তারপর সনদ প্রদান করা হচ্ছে। একই ব্যক্তির মৃত্যু সনদ দুই ভিন্ন তারিখে হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে “

এসব বিষয়ে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল আরা জানান- বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Related Articles

Back to top button