বিশেষ সংবাদ

খোলা আকাশের নিচে এক অসহায় মায়ের কান্নায় ভারী বাতাস

জাহাঙ্গীর আলম,জামালপুর: খোলা আকাশই এখন তার ছাদ, আর পিচঢালা শক্ত সড়কটাই শয্যা। বয়স ষাটের কোঠায়, শরীরটাও আর সায় দেয় না। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে এই বয়সে এসে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে রাস্তার পাশে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন জামালপুর সদর উপজেলার নরুন্দি ইউনিয়নের ব্রহ্মোত্তর গ্রামের বাসিন্দা আমেনা বেগম (৬০)। গত কয়েকদিন ধরে পর্যাপ্ত খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আর নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাত সন্তানের এই জননী। তার এই করুণ পরিস্থিতি দেখে স্তব্ধ স্থানীয় মানুষ, ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আমেনা বেগম তার প্রয়াত স্বামীর রেখে যাওয়া বসতভিটাতেই কোনোমতে মাথা গুঁজে বসবাস করছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি গ্রামের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তার সেই এক চিলতে জমিতে। অভিযোগ উঠেছে- প্রভাবশালীদের কূটকৌশল ও ক্ষমতার দাপটে তাকে নিজ ঘর থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। আশ্রয়হীন হয়ে পড়া এই বৃদ্ধার এখন নিজের বলতে কোনো ঘর নেই, নেই দুবেলা রান্নার ব্যবস্থা। তীব্র গরম আর ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে অসুস্থ শরীর নিয়ে দিন-রাত পার করছেন খোলা আকাশের নিচে।

ঘটনার ভয়াবহতা দেখে এলাকাবাসী প্রশাসনের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও মানবিক আবেদন জানিয়ে আসছিলেন। তারা দাবি তোলেন, অতি দ্রুত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা হোক। জমি দখলের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আমেনা বেগমকে তার স্বামীর বসতভিটায় পুনর্বাসনসহ তার খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তারা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হলে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন।

গণমাধ্যম ও স্থানীয়দের মারফত সংবাদটি পাওয়া মাত্রই নজিরবিহীন দ্রুততায় সাড়া দেন জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনিন আখতার। ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

ইউএনও-র নির্দেশনা অনুযায়ী, নরুন্দি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যদের একটি বিশেষ দল অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা সরেজমিনে আমেনা বেগমের কষ্টের তীব্রতা প্রত্যক্ষ করেন এবং উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করেন যে, এই অসহায় বৃদ্ধার প্রতি কোনো অন্যায় হতে দেওয়া হবে না।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির একটি মানবিক সমাধান নিশ্চিত করা হয়। আপাতত আমেনা বেগমকে তার পরিবারের নিকট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার সার্বিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, তার অসুস্থ শরীরের যথাযথ চিকিৎসার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

মাথা গোঁজার ঠাঁই ফিরে পাওয়ার এই আশ্বাসে অশ্রুসিক্ত চোখে প্রশাসন ও এলাকাবাসীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অসহায় আমেনা বেগম। স্থানীয়রা প্রশাসনের এই দ্রুত ও মানবিক পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং এর একটি স্থায়ী আইনি সমাধান প্রত্যাশা করছেন।

Related Articles

Back to top button