৬০ বছর বয়সেও ভিক্ষায় চলে ৬ জনের সংসার: জোটেনি সরকারি ভাতা
এম আর সাইফুল, মাদারগঞ্জ: জামালপুরের মাদারগঞ্জে ৬০ বছর বয়সী ফজিলা বেগমের ভিক্ষার সামান্য আয়েই চলে ছয় সদস্যের সংসার। যে বয়সে বিশ্রাম পাওয়ার কথা, সে বয়সে পরিবার বাঁচাতে প্রতিদিন ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে এই বৃদ্ধাকে। অভাবের তাড়নায় দিন পার করলেও দীর্ঘ সাত বছরেও তার কপালে জোটেনি একটি সরকারি বিধবা ভাতার কার্ড।
মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নের পশ্চিম মোসলেমাবাদ এলাকার বাসিন্দা ফজিলা বেগম সাত বছর আগে স্বামী খোকা মিয়াকে হারান। এরপর কর্মক্ষমতাহীন একমাত্র ছেলে, পুত্রবধূ ও তিন নাতির দায়িত্ব এসে পড়ে তার ওপর। নিজস্ব কোনো জমি না থাকায় অন্যের জায়গায় একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে পরিবারটি। যেখানে নলকূপ কিংবা শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই। একদিন ভিক্ষায় বের হতে না পারলে সেদিন চুলায় আগুন জ্বলে না তাদের।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও ফজিলা বেগম নাতিদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। তিন নাতির মধ্যে একজন এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে এবং অন্য দুজন ষষ্ঠ ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।
নিজের করুণ অবস্থার কথা জানিয়ে চোখের জলে ফজিলা বেগম বলেন, “আমরা খুবই অসহায়। ভিক্ষা করে সংসার চালাই, তাও ভাতার কোনো কার্ড হয়নি। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, মৃত্যুর আগে যেন একটু জায়গা ও একটি ঘর পাই।”
নিজেদের এই সীমাহীন অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে ফজিলা বেগম ছেলের স্ত্রী আবেদা বেগম বলেন, “এখনো আমি কোন একটা ঘর বাড়ির জায়গা জমি সরকারের কাছেও পাইলাম না। আমি শশুর শাশুড়ির কাছেও পাই নাই। আমার জীবনডা অনেক কষ্টের। বললে আমার সারাদিনেও শেষ হবো না। দিন অনেক কষ্ট। শাশুড়ি গ্রাম করে চাইরডা চাইল দিলে আন্না করি না দিলে না করি। অনেক কষ্ট করে আমার জীবনডা যে আমি কারো ঘর পাই না ভাই বোন কিচ্ছু নাই আমার। পোলাপানরে নিয়ে আল্লাহ অনেক কষ্ট করতাছি।”
অসুস্থ ছেলে শহীদুল্লাহ নিজের আক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা প্রকাশ করে বলেন, “মায়ে যা ইনকাম করে নেয় মাইনষের কাছ থেইককা চাইয়া চিন্তে নিয়া আসে। ঐডাই আমরা ছয়জন মানুষ একই ভাগে খাই। মা মরা গেলে কেমনে চলি আল্লাহ পাক ভালো জানে। দেহেন বর্তমানে আমি ইনকাম করতে পারি না শরীরের কন্ডিশন ভালো না।”
অভাবের সংসারে হাল ধরার স্বপ্ন দেখা বড় নাতি আরিফ ইসলামের কণ্ঠেও চরম হতাশা। সে জানায়, “সরকারে এত অনুদান কিন্তু আমাদের কোন অনুদান কিচ্ছু দিচ্ছে না। আমাদের একটা বাথরুম নাই। একটা ঘর বাড়ি কোন কিচ্ছু নাই। আমরা মনে করেন যে, দিন আইনা দিন খাই। আমার দাদিরে দিয়া চলি আমাদের কিচ্ছু নাই। আমরা অনেক কষ্টে আছি।”
প্রতিবেশীরা জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের চরম অবহেলায় পরিবারটি দিনের পর দিন অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। এই আধুনিক সময়ে এসেও স্থানীয় মেম্বার বা চেয়ারম্যান কেউই তাদের খোঁজ নিতে আসেন না। হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি কোনো সাহায্যও তাদের কপালে জোটে না।
মন্তু শেখ প্রতিবেশী বলেন, “এই ঘরের মধ্যে চার পাঁচজন মানুষ শুইদ্যা থাহে। চলাফেরা হাগা মুতা প্রসাব ঠান্ডা কত কষ্ট বন্ধা বন্ধি করে। কত মানুষে কওয়া হয় যে তোমরা এলা এডা খোজ খবর নেও, তা কেউই খোজ খবর নেয় না।”
রেবা নামের প্রতিবেশী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেম্বার আইসাও দেহে না, চেয়ারম্যান আইসাও দেহে না। কোন ভাতা হুতা কিছুই দেয় না। ছেলেডা পড়াশোনা করতাছে বড় কষ্ট করে। মাইনষে সরকারের মাইনষে কত কিছু দেয়, ওগোরে কিচ্ছু দেয় না। ভাতের কষ্ট, ঘর নাই, পায়খানা নাই, কাপড় চোপড় পায় না কত কষ্ট।”
এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম খালেক জানান- বৃদ্ধা ফজিলা বেগম বিধবা ভাতার আওতায় আসেননি বিষয়টি জানা ছিল না। আবেদন করলে তাকে দ্রুত ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া সরকারের কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের অন্য সুবিধাও দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী জানান- ফজিলা বেগমের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত তাকে বিধবা ভাতার আওতায় আনার পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।




