জামালপুরপ্রধান খবর

স্বপ্নের ‘জামালপুর এক্সপ্রেস’ এখন যাত্রী দুর্ভোগের ট্রেন

স্টাফ রিপোর্টার: জামালপুরবাসীর প্রতীক্ষা ও স্বপ্নের বাস্তব রূপ ছিল আন্তঃনগর ‘জামালপুর এক্সপ্রেস’ ট্রেন। ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানিকৃত সর্বাধুনিক পিটি ইনকা কোচের আরামদায়ক ও বিলাসবহুল এই ট্রেনটি চালুর পর এ অঞ্চলের রেল যোগাযোগে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল। তবে উদ্বোধনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় এসে রুট পরিবর্তন, অনুপযোগী সময়সূচি এবং কম দূরত্বের যাত্রীদের জন্য আসন বরাদ্দ না থাকায় ট্রেনটির সেই গৌরব ম্লান হতে বসেছে। বর্তমানে এই রুটের নিয়মিত যাত্রীদের কাছে ট্রেনটির যাত্রা এক চরম দুর্ভোগের নাম। এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে স্থানীয় যাত্রী সাধারণ ও সচেতন নাগরিক সমাজ দফায় দফায় আন্দোলন করলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি।

২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব-সরিষাবাড়ী-জামালপুর রুটে এই আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়। ট্রেনটিতে সর্বাধুনিক এয়ার ব্রেক ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব বায়ো-টয়লেট, প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ আসন ও প্রশস্ত দরজার সুবিধা রয়েছে। প্রায় ১৩টি বগিবিশিষ্ট ট্রেনটির আসন সংখ্যা ৬২০টি। যার মধ্যে ১১০টি এসি স্নিগ্ধা চেয়ার এবং ৫১০টি শোভন চেয়ার। উদ্বোধনের পর থেকে ট্রেনটি যমুনা সেতু পূর্ব হয়ে টাঙ্গাইল রুটে নিয়মিত চলাচল করছিল। কিন্তু যমুনা সেতু পূর্ব স্টেশনের সংস্কার কাজের জন্য ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ট্রেনটির রুট সাময়িকভাবে পরিবর্তন করা হয়। নতুন রুট অনুযায়ী ট্রেনটি ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও সরিষাবাড়ী হয়ে ভূঞাপুর পর্যনাত চলাচল করছে। আর এই রুট পরিবর্তনের পর থেকেই চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

নিয়মিত যাত্রীদের অভিযোগ- রুট পরিবর্তন ও দীর্ঘায়িত যাত্রাপথের কারণে ট্রেনটি এখন কার্যত ‘লোকাল ট্রেনে’ পরিণত হয়েছে। ট্রেনটির সময়সূচিও যাত্রীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা থেকে সকাল ১০টায় ছেড়ে আসা এই ট্রেনটি বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিয়ে ভূঞাপুরে পৌঁছাতে বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিট বেজে যায়। ফলে যাত্রীদের পুরো একটি কর্মদিবস পথেই নষ্ট হয়ে যায়। অপরদিকে, ঢাকা ফেরার পথে ট্রেনটি ভূঞাপুর থেকে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে গভীর রাত ১১টা ৫৫ মিনিট বা তার পরে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছায়।

এই ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াতকারী শাকিল নামের এক ভুক্তভোগী যাত্রী আক্ষেপ করে বলেন- “ঢাকা থেকে ট্রেনটি বেলা ১০টার পর ছাড়ে। ফলে জামালপুর বা সরিষাবাড়ী পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল সাড়ে ৪টা বেজে যায়। পুরো দিনটাই ট্রেনের ভেতর মাটি হয়। আবার ফেরার পথে যখন ঢাকায় পৌঁছাই, তখন রাত ১২টা বা ১টা বেজে যায়। এই মধ্যরাতে ঢাকা শহরে যাতায়াত করা শুধু কষ্টকরই নয়, চরম নিরাপত্তাহীনতারও বিষয়। বাধ্য হয়ে অনেককে কমলাপুর স্টেশনেই রাত কাটাতে হয়। অফিস বা আদালতের কাজের জন্য ঢাকায় গেলে এক রাত বেশি থাকতে হচ্ছে, যা বাড়তি খরচের বোঝা তৈরি করছে।”

যাত্রীদের আরও একটি বড় অভিযোগ হলো কাছাকাছি বা কম দূরত্বের স্টেশনগুলোর জন্য পর্যাপ্ত টিকিট বরাদ্দ না থাকা। টিকিট সংকটের কারণে এই রুটে বিনা টিকিটে ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। আতিফ নামে একজন যাত্রী জানান- কাছাকাছি দূরত্বের স্টেশনগুলোর টিকিট কাউন্টারে পাওয়া যায় না। আসন বা টিকিট অপ্রতুল হওয়ার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে বিনা টিকিটে যাতায়াত করছে। ফলে প্রতি নিয়ত সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তাছাড়া টাঙ্গাইল অঞ্চলের সাথে জামালপুরের রেলপথের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই ট্রেনটিই ছিল একমাত্র ভরসা। রুট পরিবর্তনের ফলে টাঙ্গাইলগামী যাত্রীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। রায়হান নামে আরেক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন-“এই ট্রেনটি আগে টাঙ্গাইল ও সরিষাবাড়ী হয়ে জামালপুর আসত। টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য আমাদের জেলা থেকে অন্য কোনো আন্তঃনগর ট্রেন নেই। একমাত্র ভরসা ছিল জামালপুর এক্সপ্রেস, সেটিও এখন আর এই রুটে চলে না। ফলে আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।”

সপ্তাহে রবিবার ব্যতীত বাকি ৬ দিন চলাচলকারী এই ট্রেনটি বর্তমানে কমলাপুর থেকে ভূঞাপুর পর্যন্ত যাওয়ার পথে বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ, পিয়ারপুর, জামালপুর, জাফরশাহী, সরিষাবাড়ী, তারাকান্দিসহ প্রায় ১৩টি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেয়। প্রায় ২৩৫ কিলোমিটার এই যাত্রাপথের কারণে আন্তঃনগর ট্রেনের যে গতি বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, তা ব্যাহত হচ্ছে।

বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এই ট্রেনের পূর্বের রুট পুনর্বহাল, পর্যাপ্ত আসন বরাদ্দ এবং যাত্রী বান্ধব সময়সূচির দাবিতে সরিষাবাড়ী ও জামালপুরের বাসিন্দারা মানববন্ধন, ট্রেন অবরোধ ও স্মারকলিপি প্রদানের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

এই বিষয়ে ‘সরিষাবাড়ী নাগরিক সমাজ’-এর সভাপতি মো. ইউসূফ আলী বলেন- “আমরা ট্রেনটিকে তার পূর্বের রুটে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য টানা আন্দোলন করছি। ট্রেনটি টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা গেলে সময় যেমন কম লাগত, তেমনি দুই অঞ্চলের মানুষের বন্ধন ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হতো। জামালপুরের সর্বস্তরের জনগণ আমাদের এই দাবির সাথে একমত। আমরা চাই ট্রেনটি যেন একটি সঠিক ও যাত্রীবান্ধব সময়সূচিতে পূর্বের রুটে চলাচল করে, যাতে সাধারণ মানুষ ও চাকরিজীবীরা উপকৃত হতে পারেন।”

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) এ বি এম কামরুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন- “এই রুট ও সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমানে যে সময়সূচি রয়েছে, সেটি মেনেই যাতে ট্রেনটি নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারে, আমরা সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে জনস্বার্থ ও সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।”

Related Articles

Back to top button