বকশীগঞ্জবিশেষ সংবাদ

অন্ধকার নামলেই সীমান্তে আতঙ্ক: পুশইন ঠেকাতে নির্ঘুম প্রহরা

স্টাফ রিপোর্টারঃ রাত দুইটা পেরিয়েছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। সীমান্তজুড়ে ভেসে আসছে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর টহলরত মানুষের পায়ের শব্দ। দিনের আলো নিভে গেলেও থেমে নেই সীমান্তের উদ্বেগ ও সতর্কতা।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর পুশইন চেষ্টাকে কেন্দ্র করে জামালপুর সীমান্তজুড়ে এখন বিরাজ করছে এক ধরনের অঘোষিত সতর্ক অবস্থা।

সীমান্তের ওপারে আলো জ্বলছে, আর এপারে লাঠি, ফালা ও টর্চলাইট হাতে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা। বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাতভর টহলে অংশ নিচ্ছেন শত শত গ্রামবাসী। তাদের একটাই প্রত্যয়-কোনো মূল্যে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে।

সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয়রা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারা দিচ্ছেন। কেউ রাস্তার মোড়ে, কেউ সীমান্তঘেঁষা খোলা মাঠে, আবার কেউ সরাসরি বিজিবির টহল দলের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রনি ইসলাম বলেন- “আমরা দেশের জন্য পাহারা দিচ্ছি। সীমান্ত দিয়ে কাউকে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বিজিবির সঙ্গে আমরা সবসময় আছি।”

পুশইনের কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা জীবন মিয়া বলেন- “আমাদের সীমান্তের এপাশে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। বিএসএফ অনেক সময় তাদের অংশের আলো বন্ধ করে দেয়। অন্ধকারের সুযোগে মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।”

সীমান্তের এই রাত যেন শুধু পাহারার নয়, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগেরও। কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ। যদিও স্থানীয়দের প্রতিরোধে অধিকাংশ চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও সীমান্তবাসীর মধ্যে আতঙ্ক রয়ে গেছে।

পাহারায় থাকা স্থানীয় বাসিন্দা কুদ্দুস মিয়া বলেন- “আমাদের যত কষ্টই হোক, আমরা সীমান্ত পাহারা দেব। আমাদের জীবন থাকতে কোনো ভারতীয় নাগরিককে জোর করে এ দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না।”

সীমান্তের বাস্তবতা তুলে ধরে পাররামরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সেলিম মিয়া বলেন- “আমাদের নিজস্ব কাঁটাতারের বেড়া নেই, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই। বিএসএফ যখন তাদের পাশের আলো বন্ধ করে দেয়, তখন পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। এই সুযোগে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। আমরা চাই সীমান্ত সুরক্ষায় আরও বাজেট বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন।”

দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে এই রাত যেন এক অন্যরকম দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি। জামালপুর সীমান্তে এখন রাত মানেই নিদ্রাহীন প্রহর। অন্ধকারের আড়ালে পুশইনের আশঙ্কা এবং তা প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ-সব মিলিয়ে সীমান্তজুড়ে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা।

সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয় জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমানের সঙ্গে। গভীর রাতেও তিনি নিজে সীমান্ত পরিদর্শনে ছিলেন।

তিনি বলেন, “রাত দুইটা পেরিয়ে গেছে। আমি নিজেও সীমান্ত ঘুরে দেখছি। কয়েকদিন ধরে বিএসএফ পুশইনের চেষ্টা করছে। আমরা সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছি। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবি সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন- “আমরা নির্ঘুম থেকে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছি, যাতে দেশের মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। কোনো অবস্থাতেই বিএসএফকে পুশইন করতে দেওয়া হবে না।”

Related Articles

Back to top button